১৮ জুলাই ২০২৬ - ২১:১০
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতাবা হোসেইনী খামেনেয়ীর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

ইরানের ‘শহীদ’-কে বিদায় জানাতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশাল অংশগ্রহণের বিষয়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলো তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী একটি বার্তা দিয়েছেন।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ইরানের ‘শহীদ’-কে বিদায় জানাতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিশাল অংশগ্রহণের বিষয়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়গুলো তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী একটি বার্তা দিয়েছেন।

بسم‌ الله الرّحمن الرّحیم

!মহিমান্বিত ও বিস্ময়জাগানিয়া মহান জাতি

আপনাদের সকলের প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। ইরানের শহীদ নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে মানুষের অভূতপূর্ব ঢল নামার মধ্য দিয়ে আপনারা যে অতুলনীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ সৃষ্টি করেছেন, তা ‘বি’সাত’ (ঐশ্বরিক মিশন)-এর চেতনা এবং ইসলামি-ইরানি সত্তার অবিচল সংকল্পের ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

ইসলামি উম্মাহর নেতা এবং বিপ্লবের শহীদ নেতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য, অন্তর্দৃষ্টি ও অসামান্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আপনারা এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তেহরান, কোম, মাশহাদসহ অসংখ্য শহর ও গ্রামজুড়ে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ মিছিল—যেখানে ছিল কোটি কোটি মানুষের আবেগঘন হৃদয়ের উষ্ণতা, অশ্রুসজল চোখ এবং অবিচল সংকল্প—তা একদিকে যেমন ইরানের বন্ধু ও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে, অন্যদিকে দেশটির দাম্ভিক শত্রুদের ফেলেছে চরম বিস্ময়, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আতঙ্কের মুখে।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পাশাপাশি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি ‘মহা শয়তান’-এর (Great Satan) বারবার লঙ্ঘন করার বিষয়টি আবারও সবার কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের আসলে কোনো মূল্য বা বৈধতা নেই; বরং জোর-জবরদস্তি, আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বর্বরতা হলো মার্কিন মানসিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজ ‘মহা শয়তান’ আবারও তার আসল ও মুখোশহীন রূপ উন্মোচন করেছে; এর মধ্য দিয়ে অপরাধপ্রবণতা ও বিশ্বাসঘাতকতার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা আমেরিকার অসততা, অযৌক্তিকতা, অবিশ্বস্ততা ও বিদ্বেষপরায়ণতার আরও একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

যেহেতু মার্কিন শত্রু যুদ্ধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে—যা তাদের মূল্য দিতে হবে এবং চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে—তাই তাদের জেনে রাখা উচিত যে, ইরানের প্রিয় জাতি এবং ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এর কাছে তাদের জন্য এমন সব শিক্ষা অপেক্ষা করছে যা তারা কখনোই ভুলতে পারবে না; সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসলামের যোদ্ধাদের বীরত্ব এবং দক্ষিণাঞ্চলের সাহসী জনগণের উদ্দীপনাপূর্ণ অদম্য মনোবল এরই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ইরানের অনুগত ও গর্বিত জনগণের উদ্দেশে একথা বলা অত্যন্ত জরুরি যে, এই সন্ধিক্ষণে—বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ ও প্রতারক মার্কিন শত্রুর মোকাবিলায়—ইসলামি বিপ্লবের মহান আদর্শ বাস্তবায়ন এবং আমাদের প্রিয় ইরানের সম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে সমাজের সকল স্তরে, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐক্য ও এক পবিত্র মৈত্রী বজায় রাখা অত্যন্ত অপরিহার্য।

যেমনটি বারবার এবং জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঐক্য রক্ষা করা এবং বিভাজন, রাজনৈতিক মতভেদ ও সামাজিক বিভেদকে বড় করে দেখানো থেকে বিরত থাকা একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব; তবে স্বাভাবিকভাবেই, দেশের সংহতি ও অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের—পাশাপাশি বিপ্লব, ইমাম এবং শহীদ নেতার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের—ভূমিকা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল।

সেই অনুযায়ী, এই প্রিয় জাতি—সরকারের তিনটি বিভাগের সেই নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা বজায় রেখে, যাদের জনকল্যাণ ও সমৃদ্ধি সাধনের প্রচেষ্টা সুস্পষ্ট—ইসলামি ইরানের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা সজাগ ও সক্রিয় থাকবে। এমন ব্যক্তিও থাকতে পারেন, যারা সম্পূর্ণ আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা থেকেই কোনো কোনো কর্মকর্তার কর্মকা- নিয়ে সমালোচনা করেন।

আমার মতে, তাঁদের মতো ব্যক্তিদের দ্বারা প্রদর্শিত এই নিষ্ঠা ও ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থার প্রতি উদ্বেগ নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান সম্পদ এবং তা স্বভাবতই প্রশংসনীয়; তবে এই সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ—যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব—তাঁদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।

তাঁদের নিশ্চিত করতে হবে যে, এই কর্মপদ্ধতির ফলে যেন—প্রথমত—কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি অবিচারের শিকার না হন (যেহেতু এমন কাজ ঐশ্বরিক অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়) এবং—দ্বিতীয়ত—সামাজিক ঐক্য ও সংহতি যেন ক্ষুণ্ণ না হয়; কারণ এসব বিষয় বিবেচনায় রাখলে গঠনমূলক সমালোচনা অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকেই ত্বরান্বিত করে। শত্রুপক্ষ যেন আমাদের কোনো দুর্বলতার—বিশেষ করে এ ধরনের কোনো দুর্বলতার—আভাস না পায়; বস্তুত, আমরা যদি যথাযথভাবে এই সতর্কতাগুলো মেনে চলি, তবে শত্রুপক্ষ অনিবার্যভাবেই পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হবে।...

ইরানের শহীদ নেতার সেই মহিমান্বিত বিদায়লগ্নে—নানান প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও—যেসব প্রিয় মানুষ এক ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক অধ্যায় রচনা করেছেন এবং জাতির শহীদ পিতার বিয়োগব্যথায় নিজেরাও সমব্যথী হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি আবারও আমার অন্তরের গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আমি পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ (মা’রাজে'), আলেম-উলামা, চিন্তাবিদ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি; বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার প্রতি; এবং গর্বিত ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’ (Resistance Front) ও মহিমান্বিত ইসলামি আন্দোলনের যেসব কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আশা করি, যাঁরা এই ঐতিহাসিক ও মহাকাব্যিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছেন, সমর্থন জুগিয়েছেন কিংবা কোনোভাবে সংহতি প্রকাশ করেছেন—তাঁরা সকলেই আমাদের ‘মাওলা’ যুড়ের ইমামের (আল্লাহ তাঁর মহান পুনরাবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) বিশেষ অনুগ্রহ ও দোয়ার ভাজন হবেন।

সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী

২৬ তীর-১৪০৫

১৮ জুলাই, ২০২৬

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha